চক্ষু হাসপাতালের ট্রাস্টে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে কোটি কোটি টাকার লেনদেন
প্রকাশের সময় :
২০ ঘন্টা আগে
২১
পড়া হয়েছে
চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতালে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ, দুদকে নথিভুক্ত অভিযোগে নানা অনিয়মের তথ্য
স্বাধীন খবর নিজস্ব প্রতিবেদক | ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতালের ট্রাস্ট পরিচালনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাৎ, ব্যাংক হিসাবের সিগনেটরি পরিবর্তন, নগদ আদায়ের অর্থ ব্যাংকে জমা না দেওয়া, ভুয়া ও অতিরিক্ত বিল-ভাউচার, চিকিৎসা সরঞ্জাম অতিরিক্ত দামে কেনাকাটা, স্বজনপ্রীতি এবং ট্রাস্টের অর্থ ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে ২০২৪ সালের ২৯ মে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠাতা ডা. রবিউল হোসেনের মৃত্যুর পর ট্রাস্ট দলিলের বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই ট্রাস্টের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও ব্যাংক হিসাবের নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তন করা হয়।
অভিযোগে হাসপাতালের আর্থিক লেনদেন, কেনাকাটা, আইনি ব্যয়, নিয়োগ, শিক্ষার্থী ভর্তি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পদ নিয়েও একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটিই আদালত বা তদন্তকারী সংস্থার চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়। অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি, ব্যাংক হিসাব, অডিট প্রতিবেদন, আয়কর নথি, আমদানি কাগজপত্র ও ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্ত যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের দাবি, একপর্যায়ে হাসপাতালের দরিদ্র রোগীদের কাছ থেকে নগদে ৯ থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত আদায় হলেও এর মধ্যে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা ব্যাংকে জমা হয়নি। এ দাবির সত্যতা যাচাইয়ে ক্যাশ রেজিস্টার, দৈনিক কালেকশন স্টেটমেন্ট, ব্যাংক লেজার ও জমার রসিদ পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় ‘শান গ্লোবাল’ নামের একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অস্বাভাবিক বেশি দামে পণ্য কেনা এবং অর্থ বিদেশে পাচারের অভিযোগও রয়েছে। তবে এ অভিযোগ যাচাইয়ের জন্য এলসি, ইনভয়েস, বিল অব এন্ট্রি, ব্যাংক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বৈধতা পরীক্ষা করা জরুরি।
হাসপাতালের আইনি ব্যয় নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে বার্ষিক লিগ্যাল ফি ছিল প্রায় ৩ লাখ ৮২ হাজার টাকা, দুই বছরের ব্যবধানে তা বেড়ে প্রায় ৮০ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। এমনকি ট্রাস্টের অর্থ দিয়ে ব্যক্তিগত মামলার ব্যয় পরিশোধ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। এসব দাবির সত্যতা জানতে মামলার নথি, আইনজীবীদের বিল, পেমেন্ট ভাউচার এবং ট্রাস্টি বোর্ডের অনুমোদন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অভিযোগে আরও রয়েছে—কেনাকাটা ও উন্নয়নকাজে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো, অসম্পূর্ণ কাজের বিল পরিশোধ, ট্রাস্টি বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া তহবিল পুনর্বণ্টন, অবসর-পরবর্তী নিয়োগে অনিয়ম এবং শিক্ষা কার্যক্রমে স্বজনপ্রীতি।
এদিকে সংশ্লিষ্টদের সম্পদ নিয়েও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, কয়েকজনের আয় ও ঘোষিত সম্পদের মধ্যে অসামঞ্জস্য রয়েছে। এসব অভিযোগ যাচাইয়ে আয়কর রিটার্ন, ব্যাংক হিসাব, ভূমি রেজিস্ট্রি, সম্পদ বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে ডা. রাজীব হোসেনের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা বলতে পারবেন। তিনি নিজে ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য নন।
দুদকের প্রধান কার্যালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তাও চক্ষু হাসপাতালের আর্থিক অনিয়ম ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে তা কমিশনের তফসিলভুক্ত অপরাধের আওতায় পড়ে কি না যাচাই করা হয়। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
তিনি বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে ব্যাংক হিসাব, অডিট রিপোর্ট, আয়-ব্যয়ের নথি, ক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্র, সম্পদ বিবরণীসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক দলিল পরীক্ষা করা হতে পারে।
অভিযোগকারীদের দাবি, হাসপাতালের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ট্রাস্ট দলিলের বিধান অনুযায়ী বৈধ ট্রাস্টি বোর্ড পুনর্গঠন এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।