, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
আন্তর্জাতিক সংসদীয় অঙ্গনে বাংলাদেশের দুই অর্জন হুমকির জবাব কর্মসূচিতে, সিআরএর ঘোষণা ‘মার্চ টু পুলিশ কমিশনার’ সালাম না দেওয়াকে কেন্দ্র করে ম্যাক্সে কর্মীকে মারধরের অভিযোগ দুর্গাপূজায় নৌপথের নিরাপত্তায় বাড়ছে নজরদারি, ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ শার্শা সীমান্তে সাড়ে ৭ কোটি টাকার স্বর্ণ জব্দ অপরাধী চক্রের লাগাম টানতে ২৪ বছর পর ‘ক্লিন হার্ট’-এর আদলে অভিযান সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতার অঙ্গীকারে সিআরএর নতুন সদস্যদের বরণ পার্কিংয়ে দোকান, সড়কে গাড়ি—জিইসি মোড়ে অনিয়মের জট ল্যাবএইডে ডেলিভারি চিকিৎসার খরচ নিয়ে প্রশ্ন, ৬৫ হাজার থেকে বিল ৯৮ হাজার চলন্ত ট্রাক থেকে স্ক্র্যাপ লোহা চুরি, চট্টগ্রামে পুলিশের বিশেষ নজরদারি

রৌফবাদে ‘নিষেধাজ্ঞার’ মধ্যেই জমি কেনাবেচা, উঠছে সরকারি জমি দখলের অভিযোগ

  • প্রকাশের সময় : ০৮:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
  • ১৫১ পড়া হয়েছে

রৌফবাদে ‘নিষেধাজ্ঞার’ মধ্যেই জমি কেনাবেচা, উঠছে সরকারি জমি দখলের অভিযোগ

স্বাধীন খবর নিজস্ব প্রতিবেদক :

নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চলছে লেনদেন, জাল স্বাক্ষরের অভিযোগ; সরকারি জায়গায় ভবন-দোকান নির্মাণ নিয়েও প্রশ্ন
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার রৌফবাদে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর বসতভিটার জায়গা কেনাবেচা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পত্তির আইনি জটিলতা জানা সত্ত্বেও এক শ্রেণির ব্যক্তি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে জায়গা হস্তান্তর করছেন। কোথাও আবার শরিকদের স্বাক্ষর জাল এবং গুরুত্বপূর্ণ শরিকদের তথ্য গোপন করার অভিযোগও রয়েছে।

সম্প্রতি এমন একটি জমি কেনাবেচার তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে রৌফবাদে ত্রাণ ও পুনর্বাসন-সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি জায়গা দখল ও নির্মাণকাজের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার ভিত্তিতে আরও তথ্য প্রকাশ করা হবে।

৪৭ লাখ টাকায় পাঁচ কাঠা জমি কেনার দাবি
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা শাহাদাৎ হোসেন বাহার ও মোহাম্মদ সামশুদ্দোহা প্রায় ১৫ বছর আগে রৌফবাদ এলাকার ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজার কাছ থেকে প্রায় পাঁচ কাঠা জায়গা কেনেন। এ জন্য তাঁরা প্রায় ৪৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
জায়গাটি কেনাবেচার সময় নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে টাকা লেনদেনের তথ্য এবং জায়গাটির হোল্ডিং নম্বর উল্লেখ করা হয়। সেখানে হোল্ডিং নম্বর ৬৯, ৭০ ও ৭১ উল্লেখ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
তবে জায়গাটি বিক্রির সময় ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজার পরিবারের অন্য শরিকদের সম্মতি ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সাতজনের স্বাক্ষর জালের অভিযোগ
সংশ্লিষ্টদের দাবি, জায়গাটি বিক্রির সময় শরিকদের মধ্যে সাতজনের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। তাঁরা হলেন—মো. রাজু, শাকিলা বেগম, রাজিয়া সুলতানা, রোমানা পারভিন রানি, রোজী আক্তার, ফাতেমা বেগম ও ফোরকান আলী।
এ ছাড়া মোক্তার আহম্মেদ ও তাঁর ছয় শরিক এবং ফরিদা বেগম ও তাঁর এক শরিকের তথ্যও গোপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব স্বাক্ষর সত্যিই জাল কি না, তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথির ফরেনসিক পরীক্ষা ও আইনগত প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

ভুক্তভোগী ফরিদা বেগম গং এর অভিযোগ ও আর্তনাদ:

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করেও বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের প্রভাবশালী চক্রের নানা হুমকি-ধমকিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন পরিবারগুলো। তাদের পারিবারিক সূত্রে পাওয়া  জমি এখন হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।জমির মূল শরীকদাররা আরও অভিযোগ করে বলেন, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে ভূমিদস্যুরা জাল জালিয়াতির মাধ্যমে স্টাম্প তৈরি করে জমি বেচা বিক্রি করেছে। তারা বলেন, আমরা কিছুই জানিনা এখন আমরা  অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছি।

​বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও ডিসি মহোদয় এর কাছে এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। সরকারের কাছে তাদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো হলো:

​ অবিলম্বে ভূমিদস্যু ও জালিয়াতি চক্রের মূল হোতা ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজা ও বাহারসহ নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের আইনের আওতায় এনে নিরপেক্ষ তদন্ত করা। জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা ভুয়া স্টাম্প ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের কার্যকারিতা অবিলম্বে বাতিল করা।

​ভুক্তভোগী ফরিদা গং এর দাবি তাদের  প্রাপ্ত জমি তাদের  জিম্মায় বুঝিয়ে দেওয়া এবং তাদের ও পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

​ভুমিহীন বিহারিদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি সম্পত্তি জবরদখলকারী প্রভাবশালী ও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শৈথিল্য না দেখিয়ে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও এলাকার সচেতন নাগরিকরা।

পাঁচ কাঠায় ২০ ভাড়াঘর
জায়গাটি কেনার পর শাহাদাৎ হোসেন বাহার ও মোহাম্মদ সামশুদ্দোহা সেখানে সংস্কার ও উন্নয়ন করে প্রায় ২০টি ভাড়াঘর নির্মাণ করেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পরে কলোনিটির নাম দেওয়া হয় ‘বাহার মিয়া কলোনী’।
স্থানীয়দের দাবি, এসব ভাড়াঘর থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করা হয়। সেখানে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আবাসিক গ্যাস সংযোগও রয়েছে।

এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, ২০০৯ সালের পর আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকার কথা বলা হলেও জায়গাটি ২০১১ সালের দিকে কেনা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাহলে ওই সময়ে কীভাবে সেখানে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

‘অনেক জায়গা কেনাবেচা হয়েছে’
রৌফবাদের এক উর্দুভাষী বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ এলাকায় এ ধরনের আরও অনেক জায়গা কেনাবেচা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য, জায়গা কেনাবেচার ক্ষেত্রে অনেক সময় নিবন্ধিত দলিলের পরিবর্তে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তি করা হয়। সেখানে জমির পরিমাণ, হোল্ডিং নম্বর, মূল্য, ক্রেতা-বিক্রেতার নাম-ঠিকানা ও সাক্ষীদের তথ্য রাখা হয়।
তিনি দাবি করেন, জায়গা বিক্রির বিষয়ে প্রশাসনের বিধিনিষেধ থাকার পরও প্রভাবশালী একটি মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে এসব লেনদেন চলছে।

অভিযোগের পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার দাবি
বিহারীদের সংগঠন এডহক কমিটির চেয়ারম্যান জাহিদ হোসেন লিটন বলেন, রৌফবাদে জায়গা কেনাবেচার বিষয়টি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখার তৎকালীন কর্মকর্তা সাইফুর রহমান মজুমদারকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ করেন জাহিদ হোসেন।

জাহিদ হোসেন লিটনের অভিযোগ, এডহক কমিটিতে আসার পর তিনি ত্রাণ ও পুনর্বাসনের বেহাত বা বেদখল হওয়া প্রায় ৮ একর ৪১ শতাংশ জায়গা উদ্ধারের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়েছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি।

সরকারি জায়গায় ভবন নির্মাণের অভিযোগ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রৌফবাদের আরেক বাসিন্দা দাবি করেন, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ১১ দাগের প্রায় চার গণ্ডা জায়গায় একটি বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। রুবেল নামের এক ব্যক্তি ওই ভবন নির্মাণ করছেন বলে তিনি জানান।

তাঁর দাবি, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখার কর্মকর্তাসহ জেলা প্রশাসককে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও নির্মাণকাজ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।

একই বাসিন্দা আরও দাবি করেন, রৌফবাদের ১ নম্বর খতিয়ানের প্রায় ২৪ শতাংশ জায়গা দখল করে সোলায়মান, ফারুক ও রনি নামের কয়েকজন দোকান নির্মাণ করছেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও চাঁন্দগাঁও ভূমি সার্কেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।

প্রশাসনের বক্তব্য
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান বলেন, কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে অথবা গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তাঁরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য একটি কমিটি রয়েছে বলেও জানান তিনি।

গ্যাস সংযোগ নিয়ে প্রশ্ন
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের গ্যাস সংযোগ বৈধ নয়।
কোম্পানিটির জেনারেল ম্যানেজার (বিক্রয় ও বিতরণ) প্রকৌশলী রফিক খান বলেন, এ ধরনের গ্যাস সংযোগ অবৈধ হলে অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জেনারেল ম্যানেজার ও সিনিয়র প্রকৌশলী আবু জাহেরের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

ক্রেতা-বিক্রেতার বক্তব্য পাওয়া যায়নি
জায়গাটি কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় কেনা হয়েছে, তা জানতে ক্রেতা শাহাদাৎ হোসেন বাহারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিক্রেতা ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজার বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনিও ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। ফলে জায়গাটি কোন আইন বা প্রক্রিয়ায় বিক্রি করা হয়েছে, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্যও জানা সম্ভব হয়নি।

আইনি প্রশ্ন
জমির মালিকানা, সরকারি সম্পত্তির চরিত্র, শরিকদের সম্মতি, স্বাক্ষরের সত্যতা এবং দলিল নিবন্ধনের বিষয়গুলো যাচাই না করে শুধু নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তির ভিত্তিতে জমি কেনাবেচা করলে এর আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

তাই রৌফবাদে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর বসতভিটার জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে কোন সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানাধীন, কোনটি ত্রাণ ও পুনর্বাসন-সংশ্লিষ্ট এবং কোন সম্পত্তি পরিত্যক্ত সম্পত্তির আওতায় পড়ে—তা নির্ধারণ করে সরকারি নথিপত্র যাচাই করা জরুরি।

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিলে রৌফবাদে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা জমি কেনাবেচা, দখল ও নির্মাণ নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোরও নিষ্পত্তি হতে পারে।

আন্তর্জাতিক সংসদীয় অঙ্গনে বাংলাদেশের দুই অর্জন

রৌফবাদে ‘নিষেধাজ্ঞার’ মধ্যেই জমি কেনাবেচা, উঠছে সরকারি জমি দখলের অভিযোগ

প্রকাশের সময় : ০৮:২৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬

রৌফবাদে ‘নিষেধাজ্ঞার’ মধ্যেই জমি কেনাবেচা, উঠছে সরকারি জমি দখলের অভিযোগ

স্বাধীন খবর নিজস্ব প্রতিবেদক :

নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চলছে লেনদেন, জাল স্বাক্ষরের অভিযোগ; সরকারি জায়গায় ভবন-দোকান নির্মাণ নিয়েও প্রশ্ন
চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার রৌফবাদে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর বসতভিটার জায়গা কেনাবেচা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব সম্পত্তির আইনি জটিলতা জানা সত্ত্বেও এক শ্রেণির ব্যক্তি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তির মাধ্যমে জায়গা হস্তান্তর করছেন। কোথাও আবার শরিকদের স্বাক্ষর জাল এবং গুরুত্বপূর্ণ শরিকদের তথ্য গোপন করার অভিযোগও রয়েছে।

সম্প্রতি এমন একটি জমি কেনাবেচার তথ্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে রৌফবাদে ত্রাণ ও পুনর্বাসন-সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি জায়গা দখল ও নির্মাণকাজের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার ভিত্তিতে আরও তথ্য প্রকাশ করা হবে।

৪৭ লাখ টাকায় পাঁচ কাঠা জমি কেনার দাবি
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীপুরের বাসিন্দা শাহাদাৎ হোসেন বাহার ও মোহাম্মদ সামশুদ্দোহা প্রায় ১৫ বছর আগে রৌফবাদ এলাকার ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজার কাছ থেকে প্রায় পাঁচ কাঠা জায়গা কেনেন। এ জন্য তাঁরা প্রায় ৪৭ লাখ টাকা পরিশোধ করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
জায়গাটি কেনাবেচার সময় নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে টাকা লেনদেনের তথ্য এবং জায়গাটির হোল্ডিং নম্বর উল্লেখ করা হয়। সেখানে হোল্ডিং নম্বর ৬৯, ৭০ ও ৭১ উল্লেখ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
তবে জায়গাটি বিক্রির সময় ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজার পরিবারের অন্য শরিকদের সম্মতি ছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সাতজনের স্বাক্ষর জালের অভিযোগ
সংশ্লিষ্টদের দাবি, জায়গাটি বিক্রির সময় শরিকদের মধ্যে সাতজনের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে। তাঁরা হলেন—মো. রাজু, শাকিলা বেগম, রাজিয়া সুলতানা, রোমানা পারভিন রানি, রোজী আক্তার, ফাতেমা বেগম ও ফোরকান আলী।
এ ছাড়া মোক্তার আহম্মেদ ও তাঁর ছয় শরিক এবং ফরিদা বেগম ও তাঁর এক শরিকের তথ্যও গোপন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব স্বাক্ষর সত্যিই জাল কি না, তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট নথির ফরেনসিক পরীক্ষা ও আইনগত প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

ভুক্তভোগী ফরিদা বেগম গং এর অভিযোগ ও আর্তনাদ:

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা করেও বিগত আওয়ামীলীগ সরকারের প্রভাবশালী চক্রের নানা হুমকি-ধমকিতে কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন পরিবারগুলো। তাদের পারিবারিক সূত্রে পাওয়া  জমি এখন হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বর্তমানে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।জমির মূল শরীকদাররা আরও অভিযোগ করে বলেন, বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে ভূমিদস্যুরা জাল জালিয়াতির মাধ্যমে স্টাম্প তৈরি করে জমি বেচা বিক্রি করেছে। তারা বলেন, আমরা কিছুই জানিনা এখন আমরা  অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়েছি।

​বর্তমান সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির আলোকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও ডিসি মহোদয় এর কাছে এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা। সরকারের কাছে তাদের সুনির্দিষ্ট দাবিগুলো হলো:

​ অবিলম্বে ভূমিদস্যু ও জালিয়াতি চক্রের মূল হোতা ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজা ও বাহারসহ নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের আইনের আওতায় এনে নিরপেক্ষ তদন্ত করা। জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা ভুয়া স্টাম্প ও সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রের কার্যকারিতা অবিলম্বে বাতিল করা।

​ভুক্তভোগী ফরিদা গং এর দাবি তাদের  প্রাপ্ত জমি তাদের  জিম্মায় বুঝিয়ে দেওয়া এবং তাদের ও পরিবারের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

​ভুমিহীন বিহারিদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি সম্পত্তি জবরদখলকারী প্রভাবশালী ও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শৈথিল্য না দেখিয়ে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও এলাকার সচেতন নাগরিকরা।

পাঁচ কাঠায় ২০ ভাড়াঘর
জায়গাটি কেনার পর শাহাদাৎ হোসেন বাহার ও মোহাম্মদ সামশুদ্দোহা সেখানে সংস্কার ও উন্নয়ন করে প্রায় ২০টি ভাড়াঘর নির্মাণ করেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। পরে কলোনিটির নাম দেওয়া হয় ‘বাহার মিয়া কলোনী’।
স্থানীয়দের দাবি, এসব ভাড়াঘর থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করা হয়। সেখানে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির আবাসিক গ্যাস সংযোগও রয়েছে।

এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, ২০০৯ সালের পর আবাসিক খাতে নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকার কথা বলা হলেও জায়গাটি ২০১১ সালের দিকে কেনা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তাহলে ওই সময়ে কীভাবে সেখানে গ্যাস সংযোগ দেওয়া হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

‘অনেক জায়গা কেনাবেচা হয়েছে’
রৌফবাদের এক উর্দুভাষী বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ এলাকায় এ ধরনের আরও অনেক জায়গা কেনাবেচা হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে।
তাঁর ভাষ্য, জায়গা কেনাবেচার ক্ষেত্রে অনেক সময় নিবন্ধিত দলিলের পরিবর্তে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তি করা হয়। সেখানে জমির পরিমাণ, হোল্ডিং নম্বর, মূল্য, ক্রেতা-বিক্রেতার নাম-ঠিকানা ও সাক্ষীদের তথ্য রাখা হয়।
তিনি দাবি করেন, জায়গা বিক্রির বিষয়ে প্রশাসনের বিধিনিষেধ থাকার পরও প্রভাবশালী একটি মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে এসব লেনদেন চলছে।

অভিযোগের পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার দাবি
বিহারীদের সংগঠন এডহক কমিটির চেয়ারম্যান জাহিদ হোসেন লিটন বলেন, রৌফবাদে জায়গা কেনাবেচার বিষয়টি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখার তৎকালীন কর্মকর্তা সাইফুর রহমান মজুমদারকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে অভিযোগ করেন জাহিদ হোসেন।

জাহিদ হোসেন লিটনের অভিযোগ, এডহক কমিটিতে আসার পর তিনি ত্রাণ ও পুনর্বাসনের বেহাত বা বেদখল হওয়া প্রায় ৮ একর ৪১ শতাংশ জায়গা উদ্ধারের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়েছেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি।

সরকারি জায়গায় ভবন নির্মাণের অভিযোগ
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রৌফবাদের আরেক বাসিন্দা দাবি করেন, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের ১১ দাগের প্রায় চার গণ্ডা জায়গায় একটি বহুতল ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। রুবেল নামের এক ব্যক্তি ওই ভবন নির্মাণ করছেন বলে তিনি জানান।

তাঁর দাবি, এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখার কর্মকর্তাসহ জেলা প্রশাসককে একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও নির্মাণকাজ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।

একই বাসিন্দা আরও দাবি করেন, রৌফবাদের ১ নম্বর খতিয়ানের প্রায় ২৪ শতাংশ জায়গা দখল করে সোলায়মান, ফারুক ও রনি নামের কয়েকজন দোকান নির্মাণ করছেন। বিষয়টি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও চাঁন্দগাঁও ভূমি সার্কেলের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ।

প্রশাসনের বক্তব্য
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান বলেন, কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে অথবা গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তাঁরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন। এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য একটি কমিটি রয়েছে বলেও জানান তিনি।

গ্যাস সংযোগ নিয়ে প্রশ্ন
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা যায়, অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের গ্যাস সংযোগ বৈধ নয়।
কোম্পানিটির জেনারেল ম্যানেজার (বিক্রয় ও বিতরণ) প্রকৌশলী রফিক খান বলেন, এ ধরনের গ্যাস সংযোগ অবৈধ হলে অভিযোগ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে জেনারেল ম্যানেজার ও সিনিয়র প্রকৌশলী আবু জাহেরের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

ক্রেতা-বিক্রেতার বক্তব্য পাওয়া যায়নি
জায়গাটি কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় কেনা হয়েছে, তা জানতে ক্রেতা শাহাদাৎ হোসেন বাহারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিক্রেতা ইশতেয়াখ আহম্মেদ রাজার বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনিও ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। ফলে জায়গাটি কোন আইন বা প্রক্রিয়ায় বিক্রি করা হয়েছে, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্যও জানা সম্ভব হয়নি।

আইনি প্রশ্ন
জমির মালিকানা, সরকারি সম্পত্তির চরিত্র, শরিকদের সম্মতি, স্বাক্ষরের সত্যতা এবং দলিল নিবন্ধনের বিষয়গুলো যাচাই না করে শুধু নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখিত চুক্তির ভিত্তিতে জমি কেনাবেচা করলে এর আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

তাই রৌফবাদে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর বসতভিটার জমি কেনাবেচার ক্ষেত্রে কোন সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানাধীন, কোনটি ত্রাণ ও পুনর্বাসন-সংশ্লিষ্ট এবং কোন সম্পত্তি পরিত্যক্ত সম্পত্তির আওতায় পড়ে—তা নির্ধারণ করে সরকারি নথিপত্র যাচাই করা জরুরি।

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নিলে রৌফবাদে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা জমি কেনাবেচা, দখল ও নির্মাণ নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোরও নিষ্পত্তি হতে পারে।