রাজনৈতিক পরিচয় দেখে অপরাধীকে ছাড় নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রকাশের সময় :
১৪ ঘন্টা আগে
২৩
পড়া হয়েছে
রাজনৈতিক পরিচয় দেখে অপরাধীকে ছাড় নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
স্বাধীন খবর সিলেট, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অপরাধীর কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় অ্যাফিলিয়েশন বিবেচনা করে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ‘অপরাধী সে অপরাধীই। অপরাধী যে-ই হোক, তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আজ মঙ্গলবার সিলেট সার্কিট হাউস মিলনায়তনে জেলা প্রশাসন আয়োজিত ‘জেলার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও উন্নয়ন সংক্রান্ত মতবিনিময় সভায়’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অপরাধ দমন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। সিলেট অঞ্চলের সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ, মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাচালানিদের তালিকা সম্পূর্ণ নির্মোহভাবে প্রস্তুত করতে হবে। স্থানীয়ভাবে অপরাধীদের পরিচয় সবার জানা থাকায় তালিকায় যেন কোনো নিরীহ মানুষকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হয়রানির জন্য অন্তর্ভুক্ত করা না হয়। একইভাবে প্রকৃত অপরাধীও যেন রাজনৈতিক বিবেচনায় বাদ না পড়ে।
আগামী এক মাসের মধ্যে এ নির্দেশনার দৃশ্যমান ফলাফল উপস্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পুলিশ বাহিনীতে ‘রিওয়ার্ড ও পানিশমেন্ট নীতি’ চালু করা হয়েছে। রেঞ্জ পুলিশ ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশকে (এসএমপি) এ নীতি কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দেন তিনি।
ঢালাও আসামি করার প্রবণতা বন্ধের নির্দেশ
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলা পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অনেক মামলার এজাহারে ঢালাওভাবে ৫০০, ১ হাজার কিংবা ২ হাজার জনকে আসামি করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার মামলা না করলেও তৃতীয় পক্ষ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি, ব্যবসায়ীদের হয়রানি কিংবা চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে মামলা করেছে।
এর ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগী ও শহীদ পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরামের উদাহরণ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাঁর পরিবার বাদী হতে না পারলেও রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট অন্য একজন দেড় হাজার ব্যক্তিকে আসামি করে মামলা করেছেন। অথচ ভিডিও ফুটেজ ও পারিপার্শ্বিক প্রমাণের মাধ্যমে প্রকৃত জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা সম্ভব ছিল।
এ কারণে সিলেট রেঞ্জ ও মেট্রোপলিটন এলাকার এ ধরনের মামলাগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৩ ধারা অনুযায়ী নিরীহ ও অযথা হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের আসামির তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
তবে এ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের দেনদরবার বা অনৈতিক লেনদেনের সুযোগ দেওয়া যাবে না বলে সতর্ক করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রকৃত নির্দেশদাতা ও অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই বাদ না পড়ে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন তিনি।
বালি-পাথর কোয়ারি নিয়ে জাতীয় কমিটি
সিলেটের বালি ও পাথর কোয়ারি বন্ধ থাকায় সৃষ্ট পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাবের বিষয়টিও সভায় তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তাঁর নেতৃত্বে একটি জাতীয় কমিটি ইতোমধ্যে কাজ করছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং আদালতের নির্দেশনা সমন্বয় করে প্রস্তুত করা রেজুলেশন বা কার্যবিবরণী অনুযায়ী কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এ সংক্রান্ত আদালতের মামলার দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত আইনি জটিলতা নিরসনের নির্দেশ দেন তিনি।
সীমান্ত এলাকায় পাহাড়ি ঢলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও পরিবেশের ক্ষতি রোধে মনিটরিং টিমের মাধ্যমে সার্বিক তদারকি জোরদারের আহ্বানও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
‘মব’ সংস্কৃতি সহ্য করা হবে না
‘মব’ বা অরাজকতা সৃষ্টির অপসংস্কৃতি সরকার কোনোভাবেই সহ্য করবে না বলে মন্তব্য করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, দাবিদাওয়া আদায়ের নামে সড়ক অবরোধ বা ঘেরাও না করে প্রচলিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিষয়গুলো তুলে ধরতে হবে। স্মারকলিপি দেওয়া বা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দাবি জানানো যেতে পারে।
২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে মবের ঘটনা ৫০ শতাংশের বেশি কমেছে জানিয়ে তিনি সিলেট অঞ্চলকেও সম্পূর্ণ মবমুক্ত রাখার আহ্বান জানান।
শীর্ষ ৫০ মাদক কারবারির তালিকা
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেটকে মাদকমুক্ত করতে পুলিশ প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সক্ষমতা প্রদর্শনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, সাধারণ মাদকসেবীদের পেছনে না ছুটে শীর্ষ অন্তত ৫০ জন মাদক কারবারির একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করতে হবে। এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে ওই তালিকার ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে হবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের ভৌগোলিক আয়তনে সর্ববৃহৎ মেট্রোপলিটন পুলিশ এলাকা হিসেবে এসএমপির লজিস্টিক সংকট দূর করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নতুন পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন এবং পর্যাপ্ত পুলিশি যানবাহন সরবরাহের বিষয়েও তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
সাধারণ মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জনে প্রতিটি পুলিশ ইউনিটকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।
সভায় আরও বক্তব্য দেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য আবদুল মালেক, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী, সিলেট-৫ আসনের সংসদ সদস্য মুফতি মোহাম্মদ আবুল হাসান এবং বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী।
এ সময় সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সিলেট বিভাগীয় কমিশনার মো. মশিউর রহমান, সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম, জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন, পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকী সাহা।
সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের অপরাধ দমনে পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার এবং অপরাধীদের বিষয়ে দ্রুত তথ্য সংগ্রহ করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেন।