ঋণখেলাপির অভিযোগ থেকে নারী ব্ল্যাকমেইল—ইলিয়াসের বিতর্কিত সাম্রাজ্য ঘিরে তোলপাড়
প্রকাশের সময় :
৩ ঘন্টা আগে
১৭
পড়া হয়েছে
ব্যাংকের হাজার কোটি টাকার ঋণ, বিদেশে সম্পদের অভিযোগ; চট্টগ্রামে ইলিয়াসকে ঘিরে নানা প্রশ্ন ঋণখেলাপির মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানার তথ্য, নারীকে প্রলোভন ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ
স্বাধীন খবর নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইলিয়াসকে ঘিরে একের পর এক গুরুতর অভিযোগ সামনে আসছে। ব্যাংকঋণ পরিশোধ না করা, একাধিক ব্যাংকের বিপুল অঙ্কের অর্থ আটকে রাখা, বিদেশে সম্পদ গড়ে তোলা এবং নারীদের প্রলোভন দেখিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি লিবার্টি গ্রুপের চেয়ারম্যান হিসেবে পরিচিত।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণের নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ গ্রহণের পর তা পরিশোধ না করে তিনি ঋণখেলাপিতে পরিণত হন। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির তথ্যও পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্ট মামলার নম্বর, আদালতের আদেশ এবং ঋণের পরিমাণের নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে, চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন অভিজাত আবাসিক এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট কেনা এবং সেগুলোতে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণী, বেসরকারি ব্যাংকের নারী কর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নারীদের অর্থ ও দামি উপহারের প্রলোভন দেখিয়ে সম্পর্ক গড়ে তুলতেন তিনি। পরে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্র ধরে তাঁদের ব্ল্যাকমেইল ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ রয়েছে।
অভিজাত এলাকার ফ্ল্যাট ঘিরে অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, নগরের সুগন্ধা, পাঁচলাইশ, নাসিরাবাদ সোসাইটি, দেবপাহাড়, এম এম আলী রোড ও খুলশী এলাকায় নিজের এবং প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে একাধিক ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে। এসব ফ্ল্যাটের কয়েকটিতে অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নারীদের পারিবারিক ও আর্থিক অবস্থা বুঝে তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা হতো। কাউকে বিয়ের প্রলোভন, কাউকে আর্থিক সহায়তা, আবার কাউকে দামি উপহার দেওয়ার মাধ্যমে সম্পর্কের জালে জড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও কিংবা সম্পর্কের তথ্য ব্যবহার করে তাঁদের চাপে রাখার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ভুক্তভোগীদের সরাসরি বক্তব্য, ডিজিটাল আলামত এবং সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাটগুলোর মালিকানা ও ব্যবহারসংক্রান্ত তথ্য প্রয়োজন।
এম এম আলী রোডের ফ্ল্যাট নিয়ে প্রশ্ন
নগরের এম এম আলী রোডের আমানত হাইটস ভবনের ষষ্ঠ তলার একটি ফ্ল্যাটকে ঘিরেও অভিযোগ রয়েছে। করবী নামের এক নারীর ওই ফ্ল্যাটে ইলিয়াসের যাতায়াত এবং সেখানে বিভিন্ন নারীর সঙ্গে সময় কাটানোর অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, করবীকে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধুর বোন পরিচয় দিয়ে আসছেন ইলিয়াস। ফ্ল্যাটটি ব্যবহারের বিনিময়ে তাঁকে নিয়মিত অর্থ দেওয়া হতো বলেও দাবি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আমানত হাইটস ভবনে গেলে ফ্ল্যাটটির ব্যবস্থাপক সাংবাদিকদের সেখানে যেতে বাধা দেন এবং ইলিয়াসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে ফ্ল্যাটের প্রকৃত মালিকানা, ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
ছয় ব্যাংকের ঋণ নিয়ে প্রশ্ন
ইলিয়াসের বিরুদ্ধে ওয়ান ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া এবং তা পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব ব্যাংকের কাছে তাঁর ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। ঋণখেলাপির মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে ব্যাংকভিত্তিক ঋণের পরিমাণ, ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের নাম, আদালতের মামলা ও পরোয়ানার বর্তমান অবস্থা যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
দুবাইসহ বিদেশে সম্পদ গড়ার অভিযোগ
ইলিয়াসের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার ও সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দুবাই ও আজমানে একাধিক ভিলা, ফ্ল্যাট এবং জমি কেনার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর ও ব্যাংককে নামে-বেনামে সম্পদ গড়েছেন তিনি।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের বিদেশে অর্থ স্থানান্তর এবং দুবাইয়ে পালিয়ে যেতে সহযোগিতার অভিযোগও উঠেছে। সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসির ছেলে মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজন ব্যবসায়ীর অর্থ বিদেশে পাচারের সঙ্গে ইলিয়াসের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে ব্যাংক লেনদেন, সম্পত্তির দলিল, কোম্পানির মালিকানা কিংবা সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার তদন্তের তথ্য এখনো প্রকাশ্যে যাচাই করা যায়নি।
রাজনৈতিক পরিচয় বদলে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক মহলে প্রভাব বিস্তার করলেও বর্তমানে বিএনপির কয়েকজন নেতার নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন ইলিয়াস। তাঁর সঙ্গে রাজনীতিবিদ, কাস্টমস কর্মকর্তা ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও রয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মোহাম্মদ ইলিয়াসের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে প্রকাশ করা হবে।
ঋণখেলাপি, বিদেশে সম্পদ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্র ধরে নারীদের হয়রানির অভিযোগ—সব মিলিয়ে ইলিয়াসকে ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তেই অভিযোগগুলোর প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসতে পারে।
অনুসন্ধান চলবে। ঋণসংক্রান্ত নথি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং কথিত ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা নিয়ে পরবর্তী পর্ব প্রকাশ করা হবে।