প্রিন্ট এর তারিখঃ অক্টোবর ২৮, ২০২৬ || প্রকাশের তারিখঃ অক্টোবর ২৬, ২০২৬
নারীর হাতে কাজ, কৃষকের পাশে সহায়তা—গ্রাম উন্নয়নে নাজমা চৌধুরী ফাউন্ডেশন
গ্রামীণ মানুষের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে নাজমা চৌধুরী ফাউন্ডেশন
স্বাধীন খবর আয়াজ সানি নিজস্ব প্রতিবেদক:
গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা বিস্তার এবং স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে নাজমা চৌধুরী ফাউন্ডেশন। তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের স্বাবলম্বী করে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংগঠনটি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ক্ষমতায়ন—এই তিনটি বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম।

ফাউন্ডেশনটির মূল দর্শন হলো, মানুষের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে তাঁর নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি করা। এ লক্ষ্য সামনে রেখে নারীদের দক্ষতা উন্নয়ন, কৃষকদের সহায়তা, আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অসহায় ও প্রবীণ মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।
সেলাই প্রশিক্ষণে নারীর স্বাবলম্বিতার স্বপ্ন
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দিয়ে সেলাই ও হস্তশিল্প খাতে প্রশিক্ষণ এবং উপকরণ সহায়তা দিচ্ছে নাজমা চৌধুরী ফাউন্ডেশন। সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৫০টির বেশি পরিবারকে বিনা মূল্যে সেলাই মেশিন, কাঁচি, ফিতা, গজ কাপড় ও প্রাথমিক প্রশিক্ষণসামগ্রী দেওয়া হয়েছে।

এ উদ্যোগের লক্ষ্য, নারীরা যেন পরিবারের অন্যান্য দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি নিজ বাড়িতে বসেই আয় করার সুযোগ পান। এতে পারিবারিক অর্থনীতিতে তাঁদের অবদান বাড়ার পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সেলাই প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী কোমর তাঁত ও হস্তশিল্পের বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে তৈরি পণ্যকে আধুনিক নকশার সঙ্গে সমন্বয় করে বাজারজাতকরণে সহায়তার পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানিয়েছে ফাউন্ডেশনটি।
নারীর ক্ষমতায়নকে কেবল আর্থিক সহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দক্ষতা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিজস্ব উদ্যোগ গড়ে তোলার সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সংগঠনটি।
আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি
গ্রামীণ নারীদের মধ্যে আইনি সচেতনতা বাড়ানো ফাউন্ডেশনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। বাল্যবিবাহ, যৌতুক, ভূমির অধিকার এবং নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের মতো বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে সচিত্র লিফলেট বিতরণ ও উঠান বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর অনেকেই প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে পুরোপুরি জানতে পারেন না। আবার নানা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে আইনি সহায়তা পাওয়ার পথও তাঁদের কাছে জটিল হয়ে ওঠে। এ পরিস্থিতিতে সহজ ভাষায় তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং মানুষের অভিজ্ঞতা ও সমস্যার কথা সরাসরি শোনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ফাউন্ডেশনটি।
এ ছাড়া ডিজিটাল তথ্যসেবার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রাপ্তি সহজ করা এবং সংশ্লিষ্ট সেবার সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ স্থাপনে সহযোগিতা করার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে সংগঠনটি।

কৃষকদের সহায়তায় জীবিকার নতুন সম্ভাবনা
কৃষিনির্ভর গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যেও কাজ করছে নাজমা চৌধুরী ফাউন্ডেশন। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, কৃষক পরিবারকে উন্নত বীজ, জৈব সার এবং আধুনিক চাষাবাদ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃষকের জীবনমান উন্নয়নে শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে কৃষকদের বাজারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং পণ্য বিক্রির সুযোগ তৈরিতে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে ফাউন্ডেশনটি।
কৃষিতে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও জ্ঞানভিত্তিক সহায়তা পেলে প্রান্তিক কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়তে পারে। পাশাপাশি বাজারসংযোগ সহজ হলে তাঁদের আয় ও জীবিকার স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হয়।
ফাউন্ডেশনটির দর্শন অনুযায়ী, স্থানীয় সম্পদ, মানুষের শ্রম ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে টেকসই জীবিকার সুযোগ তৈরি করাই গ্রামীণ উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি।

স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ
প্রত্যন্ত এলাকার অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়াতেও কাজ করছে নাজমা চৌধুরী ফাউন্ডেশন। সংগঠনটির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিনা মূল্যে স্বাস্থ্য ক্যাম্প আয়োজন, প্রবীণদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সহায়তা এবং ডিজিটাল স্বাস্থ্যবিষয়ক তথ্যসেবা দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে।
বিশেষ করে প্রবীণ ও অসহায় মানুষের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া এবং তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতা করা সামাজিক দায়বদ্ধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বয়সজনিত অসুস্থতা, আর্থিক সীমাবদ্ধতা কিংবা চিকিৎসাসেবার দূরত্বের কারণে অনেক প্রবীণ মানুষ প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে মানবিক সহযোগিতার পরিসর বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়েছে সংগঠনটি।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ এবং উপযুক্ত সেবার সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
মানবিক ও স্বাবলম্বী গ্রাম গড়ার প্রত্যয়
নাজমা চৌধুরী ফাউন্ডেশনের কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রদান নয়; বরং মানুষের দক্ষতা, সক্ষমতা ও আত্মনির্ভরশীলতা বাড়ানোর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করা। নারীর হাতে কাজের উপকরণ তুলে দেওয়া, কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, আইনি অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে সংগঠনটি।
ফাউন্ডেশনটির মতে, একটি পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়লে তার ইতিবাচক প্রভাব শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ এবং সামগ্রিক জীবনযাত্রায়ও পড়তে পারে। একইভাবে, গ্রামীণ মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সেবা পৌঁছে দেওয়া তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করে।
তবে এ ধরনের উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করে কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা, উপকারভোগীদের বাস্তব অগ্রগতি, স্বচ্ছতা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপর।
নাজমা চৌধুরী ফাউন্ডেশনের স্লোগান—‘গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর পাশে, সেবার অঙ্গীকারে’। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের সমন্বয়ে একটি শিক্ষিত, স্বাবলম্বী ও মানবিক গ্রাম গড়ে তোলাই সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য।
ফাউন্ডেশনটির প্রত্যাশা, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি তাঁদের নিজেদের সক্ষমতা বিকাশের সুযোগ তৈরি করা গেলে গ্রামীণ সমাজে ইতিবাচক ও টেকসই পরিবর্তনের পথ আরও সুগম হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, স্বাধীন খবর