প্রিন্ট এর তারিখঃ সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬ || প্রকাশের তারিখঃ সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
আশুলিয়ায় দম্পতি ও নবজাতকের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার ১
আশুলিয়ায় একই কক্ষে দম্পতি ও নবজাতকের লাশ, তিন দিনের মধ্যে রহস্য উদঘাটনের দাবি পিবিআইয়ের গ্রেপ্তার ১, আদালতে স্বীকারোক্তি; উদ্ধার নারীর মোবাইল, পরিচয়পত্র ও পার্স
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার আশুলিয়ায় তালাবদ্ধ একটি কক্ষ থেকে দম্পতি ও তাঁদের সদ্য ভূমিষ্ঠ নবজাতকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় তিন দিনের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয় (৪৪) নামের এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পিবিআই বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তির কাছ থেকে নিহত নাজমা খাতুনের ব্যবহৃত মুঠোফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও পার্স উদ্ধার করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করার পর তিনি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
গত ৫ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় হযরত আলীর বাড়ির দ্বিতীয় তলার ৫৬ নম্বর কক্ষ থেকে দুর্গন্ধ ছড়ালে স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দেন। পরে আশুলিয়া থানা-পুলিশ তালাবদ্ধ কক্ষের দরজা খুলে শয়নকক্ষ থেকে আলমগীর কবির (৪৫), তাঁর স্ত্রী নাজমা খাতুন (৩৯) এবং সদ্য ভূমিষ্ঠ একটি নবজাতকের অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করে।
এ ঘটনায় নাজমার বড় বোন শাপলা বেগম বাদী হয়ে ৬ সেপ্টেম্বর আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারা উল্লেখ করা হয়।
পিবিআই জানায়, ঘটনার পর থেকেই ঢাকা জেলা পিবিআই ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরে মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় ৮ সেপ্টেম্বর স্ব-উদ্যোগে তদন্তভার গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন এসআই আনিসুর রহমান।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ৮ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকা থেকে মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয়কে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর ভাড়া বাসা থেকে নাজমার ব্যবহৃত অ্যান্ড্রয়েড মুঠোফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও পার্স উদ্ধার করা হয়।
সম্পর্কের জেরে বিরোধ
পিবিআইয়ের তদন্ত ও আসামির আদালতে দেওয়া জবানবন্দির বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, আলমগীরের সঙ্গে হৃদয়ের আগে থেকেই পরিচয় ছিল। আলমগীর বেকার ছিলেন এবং হৃদয় সবজি বিক্রি করতেন। তাঁদের বাসার দূরত্ব ছিল হাঁটাপথে প্রায় ১০ মিনিট।
তদন্তে পিবিআই জানতে পেরেছে, বিয়ের আগে থেকেই নাজমার সঙ্গে হৃদয়ের প্রেম ও শারীরিক সম্পর্ক ছিল। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আলমগীরের সঙ্গে হৃদয়ের বিরোধ তৈরি হয়।
পিবিআইয়ের দাবি, ঘটনার দিন নাজমা ও আলমগীর হৃদয়ের বাসায় গিয়ে তাঁকে নিজেদের বাসায় নিয়ে আসেন। সেখানে পুরোনো সম্পর্কের বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতি হয়। একপর্যায়ে আলমগীর হৃদয়কে মারধর করেন এবং নাজমা তাঁকে ঝাঁটা দিয়ে আঘাত করেন।
জবানবন্দির বরাত দিয়ে পিবিআই আরও জানায়, ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে হৃদয় নাজমার পেটে লাথি মারেন। এতে নাজমা ও তাঁর গর্ভের সন্তান মারা যায় বলে আসামি দাবি করেছেন। পরে আলমগীর খুন্তি ও পাইপ দিয়ে হৃদয়কে আঘাত করলে তাঁদের মধ্যে আবারও ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে হৃদয় গামছা দিয়ে আলমগীরের গলা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন।
পিবিআইয়ের ভাষ্য, হত্যার পর তিনটি মরদেহ খাটের ওপর রেখে হৃদয় ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। যাওয়ার সময় তিনি নাজমার মুঠোফোন, সিম, অফিসের পরিচয়পত্র ও পার্স নিয়ে যান।
আগেও হত্যা মামলায় আসামি
পিবিআই জানিয়েছে, মনিরুজ্জামান ওরফে হৃদয়ের বিরুদ্ধে এর আগেও একটি হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছিল।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর আশুলিয়া থানায় ৩০২/২০১/৩৪ ধারায় একটি হত্যা মামলা হয়। গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের কাছাকাছি এলাকা থেকে অজ্ঞাতনামা এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় করা ওই মামলার তদন্তে মনিরুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরে তদন্তে ধর্ষণের আলামত পাওয়ার কথা উল্লেখ করে ওই মামলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারাও যুক্ত করা হয়। ২০২৩ সালের ৩১ জুলাই আশুলিয়া থানার চার্জশিট নম্বর ৫২৪-এর মাধ্যমে মামলাটির তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ওই মামলায় মনিরুজ্জামানকে অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি করা হয় এবং সাব্বির ইসলাম (১৫) নামের এক অপ্রাপ্তবয়স্কের বিরুদ্ধে দোষীপত্র দেওয়ার কথা জানিয়েছে পিবিআই।
আরও কেউ জড়িত কি না, খতিয়ে দেখছে পিবিআই
পিবিআই ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ, পিপিএম বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পর থেকেই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে ছায়া তদন্ত চালানো হয়। নিহত ব্যক্তিদের পূর্বপরিচিত ও তাঁদের চলাফেরার বিষয়গুলো যাচাই করে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে আসামিকে গ্রেপ্তার এবং আলামত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এ ঘটনায় অন্য কেউ জড়িত আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
পিবিআই জানায়, মামলার তদন্ত এখনো অব্যাহত রয়েছে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, স্বাধীন খবর